আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বলতে কি বুঝেন? আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধি ও বিষয়বস্ত আলােচনা করুন। বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধি কি প্রসারিত হচ্ছে ? যুক্তি দিন।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বলতে কি বুঝেন? আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধি ও বিষয়বস্ত আলােচনা করুন। বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধি কি প্রসারিত হচ্ছে ? যুক্তি দিন।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বলতে কি বুঝেন? আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধি ও বিষয়বস্ত আলােচনা করুন। বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধি কি প্রসারিত হচ্ছে ? যুক্তি দিন।


আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রতিশব্দ হল "International relations". জেরেমি বেন্থাম। International Jurisprudence এর কথা বলতে গিয়ে 'International' শব্দটির প্রথম ব্যবহার। করেছেন। বর্তমানে বিভিন্ন জাতির মধ্যে সম্পর্ক বােঝানাের জন্য 'International' শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রাষ্ট্রসমূহের পারস্পরিক সম্বন্ধ নিয়ে আলােচনা করে। বর্তমান পৃথিবীতে এমন কোন রাষ্ট্র নেই যে সম্পূর্ণভাবে নিজের উপর নির্ভর করে কিংবা অন্যদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে বিচ্ছিন্নভাবে বাস করতে পারে। প্রত্যেক রাষ্ট্রই প্রত্যক্ষ বা পরােক্ষভাবে অপর রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল। এভাবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা। রাষ্ট্রসমূহের এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতার প্রতি দৃষ্টি রেখে দ্বন্দ্ব, যুদ্ধ ইত্যাদি এড়িয়ে সহযােগিতার মাধ্যমে কিভাবে বিশ্বে শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠা করা যায়, সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলােচনার উদ্দেশ্যে ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্ক’ নামক একটি স্বতন্ত্র অধীতব্য বিষয়ের সৃষ্টি করা হয়েছে। এ সম্পর্কের পরিধি ব্যাপক হলেও এর ভিত্তি মূলত পরস্পরের নির্ভরশীলতা। তবে তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ ও উৎকর্ষে। আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ককে আরও যুথবদ্ধ করে তুলেছে।

সংজ্ঞা :
অধ্যাপক পামার ও পারকিন্স ( Norman D. Palmer and Howard c. Perkins) -এর মতে, “বিশ্বসম্প্রদায়ের মতাে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যয়নও পরিবর্তনশীল।”

অধ্যাপক কুইন্সি রাইট (Quincy Wright) বলেন, “বিশ্বের প্রধান প্রধান গুরুত্বপূর্ণ দলের আচরণের অধ্যয়নই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলােচনাভুক্ত।” এ সংজ্ঞায় আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে যথেষ্ট প্রসারিত করা হয়েছে। কারণ, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দলের মধ্যে বিভিন্ন জাতি, ব্যক্তিগত ও সাংস্কৃতিক সংস্থাসমূহ এবং বেসরকারি সংগঠনগুলাে ও তাদের মধ্যকার সম্পর্কও অন্তর্ভুক্ত।

অ্যাডি এইচ. ডকটর (Adi H. Doctor) বলেন, “আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রাষ্ট্রসমূহের ক্রিয়া, প্রতিক্রিয়া ও আন্তঃক্রিয়া নিয়ে আলােচনা করে। এখানে ক্রিয়া বলতে কোন রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত কার্যাবলিকে বােঝাবে, যা অন্য একটি রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক সংগঠনের উদ্দেশ্যে নিবেদিত । প্রতিক্রিয়া বলতে সাধারণত বােঝায় দ্বিতীয় রাষ্ট্র কর্তৃক প্রথম রাষ্ট্রের গৃহীত কার্যাবলির জবাবে কোন নির্দিষ্ট কর্মপন্থা গ্রহণ করা।

সামগ্রিক অর্থে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বলতে স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। যেমন- জাতিসংঘ, ন্যাটো, আরব লীগ প্রভৃতির মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে আলােচনাকে বুঝায়। এ ক্ষেত্রে। রাষ্ট্র একটি বিমূর্ত ধারণা (abstract concept) বলে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে সে রাষ্ট্রের সরকারকে। বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধি

এক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক যেহেতু ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক বুঝায়, সুতরাং এই সম্পর্ক ভাল ও মন্দ দুইই হতে পারে। রাষ্ট্রীয় আচরণ দু'ধরনের হতে পারে –

  1. দ্বন্দ্বমূলক আচরণ (Conflict behaviour) ও
  2. সহযােগিতামূলক আচরণ (Co-operative behaviour)।

রাষ্ট্রসমূহ নিজেদের সার্বিক বিকাশের নিমিত্তে সুসম্পর্ক গড়ে তুললে সেটা যেমন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয় তেমনি স্বার্থের সংঘর্ষ দেখা দিলে নিজেদের মধ্যে তিক্ততা গড়ে ওঠে এবং সেটাও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্যে যুক্ত হয়। সুতরাং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সহযােগিতা ও সংঘর্ষ উভয় নিয়ে গঠিত। সঙ্কটের মােকাবিলার জন্য জোট তৈরি এবং সঙ্কট মিটিয়ে ফেলার জন্য চুক্তি করাও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়বস্তু। 

দুই, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিতর কেবল জাতি বা রাষ্ট্রসমূহের মিথস্ক্রিয়া যুক্ত নয়। আরও বহু বিষয় এর আওতাভুক্ত। ন্যাটোর সামরিক সংস্থা নিয়ে যেমন আলােচনা হয় তেমনি বেসামরিক, অর্থনৈতিক, বহুজাতিক সংস্থা, গেরিলা সংগঠন প্রভৃতির কার্যক্রমও এর অন্তর্ভুক্ত। এমনকি বিজ্ঞানীরা বা ব্যবসায়ীরা যে সমস্ত সংগঠন গড়ে তােলে সে সমস্ত সংগঠনও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আওতাভুক্ত। এর প্রধান কারণ হলাে এরা আন্তর্জাতিক ঘটনাবলিকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। তাই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এদের প্রভাবমুক্ত হতে পারেনি। 

তিন, অনেক বিশেষজ্ঞই আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে সমাজ বিজ্ঞানের পর্যায়ভুক্ত করতে চেয়েছেন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মানুষের আচরণের কোন কোন দিক নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আলােচনা করে। মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। তাদের আচরণের লক্ষ্য হলাে সমাজের বিকাশ ত্বরান্বিত করা, সহযােগিতার পরিধি সম্প্রসারিত করা এবং সংঘর্ষ মিটিয়ে ফেলা। এ সবকিছুই সমাজের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট । কোন সমাজের মধ্যে এককভাবে সংঘর্ষ বা সহযােগিতা থাকে না। কেবল সংঘর্ষ নিয়ে সমাজ সামনের দিকে এগুতে পারে না। আবার সহযােগিতার একক রাজত্ব থাকলে মতবিরােধ দেখা দিবে না তা হতে পারে না। সংঘর্ষ ও সহযােগিতাকে বাস্তব সত্য মেনে নিয়ে সমাজের বিকাশের নানা দিকগুলােকে কিভাবে উন্মােচিত করা যায় তার আলােচনা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক করে।

চার, আজকের দিনে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক যুদ্ধের হাত থেকে মানবজাতিকে নিষ্কৃতি দেবার সংকল্পের আলােচনা থেকে বিন্দুমাত্র মুক্ত নয়। অতীতে যা ছিল ইউটোপীয় আজ তা ক্রমশ বাস্তবানুগ হয়ে উঠছে। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্দেশ্য হলাে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অতিবৃহৎ, বৃহৎ ও আঞ্চলিক শক্তিরা প্রায়শ নিজেদের মধ্যে মত বিনিময় করছে শান্তি ও নিরাপত্তার পরিমণ্ডল গড়ে তােলার জন্য। সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে বিভিন্ন আদান-প্রদান তথা বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার কল্যাণে সবধরনের যােগাযােগ। ক্রমশ বাড়ছে। এ সবকিছুই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে।।

পাঁচ, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলাে পররাষ্ট্রনীতি। অতীতে রাজা বা প্রধানমন্ত্রী। বা মুষ্টিমেয় কয়েকজন ব্যক্তি পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করত। আজকের দিনে পররাষ্ট্রনীতি। প্রণয়নে কেবল রাষ্ট্রনায়করা নন, আইনসভা ও বহু নাগরিক এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় আচরণ বা আদর্শ এবং সংশ্লিষ্ট রেজিমের মতাদর্শগত বিষয়াবলি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ছয়, বিভিন্ন রাষ্ট্রের জাতিগত গঠন, ভৌগােলিক অবস্থান, ঐতিহাসিক পটভূমিকা, ধর্ম বা মতাদর্শ আদৌ এক নয়। আর এই সমস্ত পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক নানা রকম। হয়ে থাকে। তাই আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে এই সমস্ত পার্থক্য নিয়ে বিশদ আলােচনা করতে হয়। সামাজিক পরিবেশ আলাদা হলে তার প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর পড়ে।

সাত, এশিয়া ও আফ্রিকার জাতীয় আন্দোলন এবং এই দুই মহাদেশের রাষ্ট্রগুলাের সঙ্গে বৃহৎ ও। অতিবৃহৎ শক্তিসমূহের সঙ্গে সম্পর্ক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। সমস্ত দেশের জাতীয় আন্দোলন একই ধারায় প্রবাহিত হয়নি। স্বাধীন হবার পরে পূর্বতন ঔপনিবেশিক শক্তি বা বৃহৎ শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক একরকম হতে পারেনি। এর প্রতিক্রিয়া জাতিসংঘের উপর কিভাবে পড়ছে অথবা। আন্তর্জাতিক ঘটনাবলিকে কিভাবে প্রভাবিত করছে তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আলােচনা করে।

আট, কেউ কেউ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বলতে ইতিহাস বা সমকালীন ঘটনাবলি বুঝাতে চান কিন্তু কার্যত তা নয়। সমকালীন ঘটনাবলির অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ, বিভিন্ন ঘটনাবলির নির্ধারণ এবং তাদের মূল্যায়নই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্যে স্থান লাভ করে। ঘটনা যেভাবে ঘটে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক হুবহু সেভাবে গ্রহণ করে না। তাছাড়া প্রতিটি ঘটনার একটি করে পরিপ্রেক্ষিত রয়েছে, সেটাও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিবেচ্য বিষয়। অতীতের ঘটনায় বর্তমানের ঘটনার কোন যােগাযােগ আছে কিনা তাও দেখা এর কাজ। 

নয়, বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় শক্তি-সাম্য এমনকি যৌথ নিরাপত্তাও ততবেশি প্রাসঙ্গিক যতবেশি প্রাসঙ্গিক পারমাণবিক নিবারণ, পারমাণবিক কৌশল, পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ এ সন্ত্রাস। এই বিষয়গুলাের সাথে শক্তির রাজনীতিকে সংশ্লিষ্ট করে এর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ বর্তমান। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ দখল করে আছে। 

দশ, আধুনিক বিশ্বে শুধু যে পারমাণবিক ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন এসেছে তা নয়, পরিবর্তন অন্যদিকেও সুস্পষ্ট। যেমন- বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযােগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, রাজনীতির চেহারাও বদলে যাচ্ছে। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলাে বিকাশশীল দেশের অর্থ-ব্যবস্থাকে কজার মধ্যে আনার অবিরাম প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সম্পদশালী দেশগুলাে উন্নয়নশীল দেশগুলাের দ্রুত বিকাশ সাধনের জন্য। প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সাহায্য দিচ্ছে। কিন্তু খুব অল্প ক্ষেত্রে এ সমস্ত সাহায্য একেবারে শর্তহীন হচ্ছে ।। সাহায্যের সঙ্গে আসছে নানা প্রকার শর্ত। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এ বিষয়গুলােকে অন্তর্ভুক্ত করে নিচ্ছে।

গতিশীল বিষয়ের নানা সমস্যা ও বিষয় নিয়ে আলােচনা করে বলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধি ক্রমশ ব্যাপক হচ্ছে। যে সমস্ত অভ্যন্তরীণ নীতি অন্য দেশকে প্রভাবিত করে বা করার সম্ভাবনা আছে সেগুলাে আজকাল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আওতায় আসছে। বর্তমানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিবিধ। প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আলােচনা করে। অতীতে এ বিষয়গুলাে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে যুক্ত ছিল না। অতএব, বলা যেতে পারে এর পরিধি বিস্তৃত হয়েছে।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক প্রসারিত হওয়ার কারণ


বর্তমানে পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতি-প্রকৃতির বিন্যাস হচ্ছে, ফলে আন্তর্জাতিক পরিধিও প্রসারিত হচ্ছে। নিম্নে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক প্রসারের কারণগুলাে আলােচনা করা হল :

১. আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিবর্তন : আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রসারিত হওয়ার প্রধান কারণ হল আন্তর্জাতিক সম্পর্কপ্রধান গতিধারা। মূলত আন্তর্জাতিক রাজনীতি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত। নতুন বিশ্বব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নববিন্যাসের সাথে সাথে আন্তর্জাতিক রাজনীতিও পরিবর্তিত হচ্ছে যার প্রভাব পড়েছে আঞ্চলিক রাজনীতিতে। ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক প্রসারিত হচ্ছে।

২. জাতীয় শক্তির ধারণা : বর্তমানে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় শক্তির ধারণা উনবিংশ শতকের শক্তির ধারণা থেকে অনেক স্বতন্ত্র। এই শতকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। কোন রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একই ধরনের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যে ক্ষমতা প্রয়ােগযােগ্য, অন্য ক্ষেত্রে সেই ক্ষমতা বা শক্তি কোন উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হতে পারে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কোন। রাষ্ট্রের অঙ্গীকার এবং অংশগ্রহণের ব্যাপকতা যত বৃদ্ধি পায়, তার সমস্যাও তত বৃদ্ধি পায়। এর ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধিও হয় প্রসারিত।

৩. উদ্ভূত জটিল বিশ্বব্যবস্থা : বর্তমান জটিল বিশ্বব্যবস্থা আন্তর্জাতিক পরিধির প্রসারের পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। যেহেতু বর্তমানে বিশ্ব পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে। দ্রুতগতিতে সেহেতু সর্বক্ষেত্রে দেখা দিচ্ছে নানা সমস্যা ও জটিলতা, ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়বস্তু বা পরিধি এবং বিষয়টির আলােচনা পদ্ধতি ও সীমানা প্রসারিত হচ্ছে। কাজেই এই বিশাল। পরিসর সম্পর্কে ধারণা অর্জনের জন্য বিভিন্ন লেখক বিভিন্ন বিষয় থেকে বিভিন্ন পদ্ধতি এবং আধুনিক প্রযুক্তির কৌশল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রয়ােগ করছে অব্যাহতভাবে।

৪. জাতীয়তাবাদের সম্প্রসারণ : বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আলােচনার ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। এখন সকল দেশের রাষ্ট্রনেতাগণ জাতীয় স্বার্থকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়রূপে গণ্য করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অভিব্যক্ত জাতীয়তাবাদ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধন করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক পরিধিও বিস্তৃত হয়ে পড়েছে।

৫. রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি : বর্তমান আন্তর্জাতিক এ যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন রাজনৈতিক ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে। এসব ঘটনাবলির যুক্তিপূর্ণ বিশ্লেষণ জনগণকে রাজনৈতিক দিক দিয়ে সচেতন করে তােলে। জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাদেরকে করেছে আরাে দক্ষ ও কর্মমুখর। জনগণের এই সচেতনতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধি বিস্তারে বিশেষ সহায়ক ভূমিকা রেখে চলেছে। 

৬. ব্যাপক প্রচারণা : আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রচারণার গুরুত্ব অপরিসীম। দেশবাসীর চিন্তাধারা ও কার্যকলাপকে প্রভাবিত করা, বিশ্বে নিজ রাষ্ট্রের মর্যাদা ও প্রভাব বৃদ্ধি করা ইত্যাদির জন্য প্রত্যেক সরকারই কমবেশি প্রচারণা করে থাকে। এ ধরনের প্রচারণা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়বস্তুর অন্তর্ভুক্ত। প্রতিযােগিতামূলক বিশ্বব্যবস্থায় এ ধরনের প্রচারণা যতই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধিও ততই প্রসারিত হচ্ছে। 

৭. আন্তর্জাতিক সংগঠনের সংখ্যা বৃদ্ধি : শান্তির প্রত্যাশায় আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে জাতিসংঘ ও জাতিপুঞ্জ ছাড়াও ন্যাটো, ন্যাম, ওয়ারশসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের সৃষ্টি হয়েছে। এ সকল সংগঠন আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। তাছাড়াও মানব সভ্যতার চাহিদা মােকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে উঠেছে নিত্যনতুন আন্তর্জাতিক সংগঠন, যেগুলাে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধিকেও প্রসারিত করছে।

৮. পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তন : আধুনিক বিশ্বে কোন রাষ্ট্রই এককভাবে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারে না। তাই আন্তর্জাতিক পটভূমি অতিদ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। আণবিক মারণাস্ত্রের প্রসার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আন্তঃরাষ্ট্রীয় নির্ভরশীলতাকে ব্যাপকতর করেছে। প্রতিটি রাষ্ট্রই নিজস্ব জাতীয় নীতি, লক্ষ্য এবং স্বার্থকে বাস্তবায়নের জন্য সচেষ্ট করে। থাকে। ফলে পররাষ্ট্রনীতির পরিধিও ব্যাপকতা অর্জন করেছে।

৯. যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা : সাম্প্রতিক নানা আন্তর্জাতিক ঘটনার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, যৌথ উদ্যোগ ব্যতীত শক্তি ও নিরাপত্তার কোন স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তােলা সম্ভব নয়। সকল রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একই ধরনের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যে ক্ষমতা প্রয়ােগযােগ্য, অন্য ক্ষেত্রে সেই ক্ষমতা বা শক্তি কোন। উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হতে পারে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কোন রাষ্ট্রের অঙ্গীকার এবং অংশগ্রহণের ব্যাপকতা। যত বৃদ্ধি পায়, তার সমস্যাও তত বৃদ্ধি পায়। এর ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধিও হয় প্রসারিত।।

বিশ্বায়নের এ যুগে মানুষের জীবনধারা জাতীয় ও সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে। পড়েছে। সমগ্র বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের দেশসমূহ রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক। ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে পরস্পরের উপর নির্ভরশীল এবং অন্যের দ্বারা প্রভাবিত, যার মধ্যে রয়েছে। কূটনীতি, দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক চুক্তি; আর এর মূলে রয়েছে প্রযুক্তিবিদ্যার বিকাশ। আর এতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রসার ঘটেছে। বর্তমান শতকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধি পূর্বাপেক্ষা অনেক বেশি বিস্তৃত হয়েছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার। অভ্যন্তরে একটি জাতীয় শক্তি থেকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বৈদেশিক নীতির প্রয়ােগ এবং আন্তর্জাতিক সংগঠনের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে চলা পর্যন্ত বিস্তৃত, যার মূলে রয়েছে বর্তমান সভ্যতার চাহিদা।



Post a Comment

0 Comments