বর্তমান বিশ্বে ১৯৪টিরও বেশি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র রয়েছে। এই রাষ্ট্রগুলাে আন্তর্জাতিক ব্যবস্তায় একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। রাষ্ট্রগুলাে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে তাদের আচরণ প্রদর্শন করে থাকে। এক্ষেত্রে সকল রাষ্ট্রের আচরণ কখনােই সমান হয় না। এক রাষ্ট্রের আচরণের সাথে অন্য আরেক রাষ্ট্রের আচরণ কখনাে সাদৃশ্য আবার কখনােবা বৈসাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। আর এসকল রাষ্ট্রের যাবতীয় কার্যকলাপের সমষ্টিই হচ্ছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র এবং ঐ সকল রাষ্ট্রে বসবাসকারী জনসমষ্টির কর্মকাণ্ডই আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রধান আলােচ্য বিষয়।
বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যান্স জে. মরগ্যানথু তার 'Politics Among Nations' গ্রন্থে বলেছেন, "International politics like all politics is a struggle for power, whatever the ultimate aims of international politics, power is always the immediate aim" opette আন্তর্জাতিক রাজনীতি হল সকল রাজনীতির মত ক্ষমতার লড়াই। আন্তর্জাতিক রাজনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য যাই-ই হােকনা কেন ক্ষমতা অর্জন হচ্ছে এর আশু এবং সর্বশেষ লক্ষ্য।
অধ্যাপক প্যাডেলফোর্ড এবং লিংকন আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে, "The contacts and associations among the governments of the different states of the world from the basis and the substance of international relations and world politics" অর্থাৎ বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের সরকারসমূহের মধ্যে যােগাযােগ এবং প্রতিষ্ঠান সমূহের মধ্যে যােগসূত্র স্থাপনজনিত সম্পর্কই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভিত্তি ও বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে। এসকল রাষ্ট্রের বিভিন্ন নীতিমালার পারস্পরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াই হচ্ছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ।
অধ্যাপক গ্রেসন ক্লার্ক এর মতে, "International politics deals with those forces which would the foreign politics of national states, the manner in which limit their effectiveness" অর্থাৎ আন্তর্জাতিক রাজনীতি যে সকল শক্তি বা কর্ম নিয়ে আলােচনা করে। সেগুলাে একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে ভূমিকা রাখে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কেমন আচরণ করবে। তা নির্ধারণ করে এবং সে সকল প্রভাব তাদের কার্যকারিতাকে সীমিত করে। সুতরাং আমরা বলতে পারি আন্তর্জাতিক রাজনীতি হল বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যকার রাজনীতি। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিভিন রাষ্ট্রের গহীত নীতিমালাগুলাের পারস্পারিক মিথস্ক্রিয়া। বিভিন্ন স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশৰ সরকারগুলাের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সম্পর্কই হল আন্তর্জাতিক রাজনীতি।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিধি ও বিষয়বস্তু :
আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিধি বা বিষয়বস্তুকে কোন নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আবদ্ধ রাখা সম্ভব নয়। কারণ এর প্রকৃতি প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। বিশ্ব প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং ক্রমান্বয়ে জটিল থেকে জটিলতর রূপ ধারণ করছে। আর এরূপ বিশ্বে আন্তর্জাতিক রাজনীতি শুধু সার্বভৌম রাষ্ট্রসমূহের সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সম্প্রদায়কেই অন্তর্ভুক্ত করে না বরং তা জাতীয় রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তনশীল সম্পর্কও অন্তর্ভুক্ত করে। আর এভাবে তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে মূল কর্মকের ভূমিকা পালন করে। নিম্নে আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিধি ও আলােচ্য বিষয়গুলাে তুলে ধরা হল
১. আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা ও তত্ত্বগত ধারণা : আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম আলােচিত বিষয় হল এর তত্ত্ব সম্পর্কে ধারণা প্রদান। এটি কখন উৎপত্তি লাভ করেছে, আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিবর্তন কী ঘটেছে এবং বাস্তবতা কী, আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রয়ােগ ইত্যাদি সম্পর্কে আলােচনা করে।
২. জাতীয় শক্তি : জাতীয় শক্তির সংজ্ঞা, জাতীয় শক্তির উপাদান, জাতীয় শক্তি কীভাবে অর্জন। করা যায়, বৃদ্ধি করা যায় এগুলাে নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি আলােচনা করে।
৩. ক্ষমতার ভারসাম্য : আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় প্রত্যেকটি রাষ্ট্র তাদের নিজ ক্ষমতা সম্পর্কে সজাগ। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলাে তাদের নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য সদা তৎপর ও সচেষ্ট থাকে। আর আন্তর্জাতিক রাজনীতি এগুলাে নিয়ে আলােচনা করে।
৪. নিরাপত্তা ও যৌথ নিরাপত্তা : বর্তমান বিশ্বে প্রতিটি সার্বভৌম রাষ্ট্র নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপকভাবে উদ্বিগ্ন। রাষ্ট্র তার নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। নিজস্ব ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি বর্তমানে রাষ্ট্রগুলাে যৌথ নিরাপত্তার দিকে বিশেষভাবে ঝুঁকে পড়ছে। আর এগুলাে নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি আলােচনা করে থাকে।
৫. সার্বভৌমত্ব : আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম আলােচিত বিষয় হল সার্বভৌমত্ব। কীভাবে সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখা যায়, সার্বভৌমত্ব শক্তিকে কীভাবে ব্যবহার করা যায় এগুলাে সম্পর্কে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ধারণা প্রদান করে।
৬. জাতীয়তাবাদ : আন্তর্জাতিক রাজনীতি জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে ধারণা প্রদান করে। জাতীয়তাবাদের বিভিন্ন উপাদান, বিভিন্ন অঞ্চলে জাতীয়তাবাদের উত্থানের কারণ ও ফলাফল সম্পর্কে আলােচনা করে।
৭. আন্তর্জাতিক আইন : বিশ্বে সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলাের মধ্যে পারস্পরিক শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য এবং বিভিন্ন রকম বিবাদের শান্তিপূর্ণ মীমাংসার জন্য আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়ােজনীয়তা অপরিসীম। আন্তর্জাতিক আইন সম্পর্কে আলােচনা করা আন্তর্জাতিক আইনের অন্যতম আলােচনার বিষয়।
৮. আন্তর্জাতিক সংগঠন : বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং বিশ্ব রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলাে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এগুলাে বিভিন্ন নীতি প্রণয়ন করছে। যেমন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর “লীগ অব নেশনস” প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে মােটামুটি একটি স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ফলে যুদ্ধাহত বিশ্বকে পুনরায় স্থিতিশীল এবং সুদৃঢ় করার জন্য জাতিসংঘ প্রচেষ্টা চালিয়েছে। বর্তমান সময় পর্যন্ত। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন বিশ্বব্যাপী তাদের কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে মানবজাতির। উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে।।
৯. কূটনীতি : কূটনীতি কী, কূটনীতির প্রয়ােগ, একজন সফল কূটনীতিক এর কার্যাবলী, বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে কীভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তােলা যায় এগুলাে সম্পর্কে আন্তর্জাতিক রাজনীতি। আলােচনা করে থাকে।
১০. বিশ্বরাষ্ট্র ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের ধারণা : আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্বরাষ্ট্র সম্পর্কে আলােচনা করে। এমনকি বিশ্ব সম্প্রদায়কে নিয়েও এখানে আলােচনা করা হয়।
১১. যুদ্ধ ও সামগ্রিক যুদ্ধ : আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় অনেক আগেই থেকেই দেখা যায় এক রাষ্ট্রের। সাথে অন্য রাষ্ট্রের যুদ্ধ বিগ্রহ জড়িত হওয়ার দৃষ্টান্ত। আন্তর্জাতিক রাজনীতি যুদ্ধের কারণ, যুদ্ধের প্রভাব, যুদ্ধোত্তর কুফল প্রভৃতি নিয়ে আলােচনা করে।।
১২. নিরস্ত্রীকরণ ও শান্তি : বর্তমান সময়ে বিশ্বের রাষ্ট্রগুলাে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তাদের অস্ত্রের মজুদ বৃদ্ধি করার পাশাপাশি অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র তৈরি করছে। এগুলাে বিশ্ব সভ্যতার জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। অস্ত্র হ্রাস করার প্রয়ােজনীয়তা সম্পর্কে আলােচনা করা আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম আলােচন্য বিষয়।
১৩. জোট নিরপেক্ষতা : জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের উদ্দেশ্য হল বিশ্বের উন্নয়নশীল রাষ্ট্র মধ্যে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। আন্তর্জাতিক সহযােগিতা বৃদ্ধি, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ও জাতীয় মুক্তির আন্দোলন বেগবান করা এগুলাে আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলােচনার বিষয়। |
১৪. স্নায়ুযুদ্ধ : স্নায়ুযুদ্ধ হল পরােক্ষ যুদ্ধ অর্থাৎ বিশ্বের পরাশক্তিগুলাের মধ্যকার বিভিন্ন মতাদর্শগত বিভক্তির ফলে স্নায়ুযুদ্ধ দেখা দেয়। এর প্রভাব বিশ্ব রাজনীতিতে সব সময় নেতিবাচক। এগুলাে রােধ করা আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম কাজ।


0 Comments