আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অধ্যয়নের বিভিন্ন পদ্ধতি


1. আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পাঠের পদ্ধতিগুলাে আলােচনা করুন। আপনি কি একে স্বতন্ত্র অধাতব্য বিষয় হিসেবে মনে করেন ? যুক্তি দিন। 
2. আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অধ্যয়নের বিশ্বস্বীকৃত পদ্ধতিগুলাে আলােচনা করুন।
    আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পাঠের কিছুসংখ্যক তত্ত্ব ও পদ্ধতি রয়েছে। প্রাচীন পদ্ধতিগুলাে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি ও আইনের ঐতিহ্যগত দিকগুলাের উপর জোর দিয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমানে বিশেষজ্ঞ ও পর্যবেক্ষকগণ আচরণ বিজ্ঞানসমূহে (Behavioural sciences) প্রদত্ত দৃষ্টিকোণ অনুসরণ করতে আরম্ভ করেছে এবং সিস্টেম বিশ্লেষণের (System analysis) মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অধিকতর ব্যাপক তত্ত্ব উন্নয়নের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং এ ব্যাপারে ইতঃপূর্বেই অনেকটা সফলও হয়েছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পাঠে এ তত্ত্বগুলাে বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
      আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পাঠের জন্য সাধারণত যে পদ্ধতিগুলাে অবলম্বন করা হয়, সেগুলােকে পাঁচভাগে ভাগ করা যায়। যথা –
      • ঐতিহাসিক পদ্ধতি/ Historical Approach. 
      • দার্শনিক পদ্ধতি/ Philosophical Approach 
      • বৈজ্ঞানিক নীতি পদ্ধতি/ Policy Science Approach 
      • সিস্টেমিক পদ্ধতি/ Systemic Approach 
      • একটি সারগ্রাহী পদ্ধতি/ An Eclectic Approach
        এছাড়াও প্রাচীন পদ্ধতিগুলাের অনুসারী যারা সনাতনপন্থী এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অনুসারী - এই দুই পক্ষ তাদের নিজ নিজ পদ্ধতিকে শ্রেষ্ঠ প্রতিপন্ন করার জন্য বিতর্ক করে থাকেন ।
          ১. ঐতিহাসিক পদ্ধতি :
            ঐতিহাসিক পদ্ধতি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটা প্রাচীন পদ্ধতি। সমসাময়িক বৈদেশিক নীতিমালা অতীত থেকে লব্ধ দৃষ্টিকোণ ও পূর্বদৃষ্টান্ত দ্বারা দৃঢ়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের উদ্দেশ্যে প্রণীত বর্তমান নীতিমালা অনেকাংশে অতীতের দ্বন্দ্ব-বিরােধ প্রভৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়। 

            ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে ঐতিহাসিক পদ্ধতির তাৎপর্য বিশেষভাবে অনুভূত হয়। কারণ এর। মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তনের ব্যাখ্যা দান সহজসাধ্য বিবেচিত হয়। যেহেতু বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে অতীতে সংঘটিত ঘটনাবলী বিশেষ সহায়তা দান করে, তাই কুটনীতি চর্চা প্রায়। সব রাষ্ট্রের জন্যই একটি আবশ্যিক বিষয় হিসেবে পরিগণিত হয়। এর ফলে আমরা দেখতে পাই যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু সংখ্যক পেশাদার কূটনীতিবিদ যথেষ্ট অবদান রেখেছেন। 

            আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিবর্তন জানতে হলে কূটনৈতিক ইতিহাস একটি প্রয়ােজনীয় যন্ত্র। হিসেবে কাজ করে। বিভিন্ন রাজনৈতিক কার্যধারা বিশ্লেষণ করতে এটা একটা উপকারী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। রাষ্ট্রীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে এবং সেই সাথে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ পদ্ধতির বিভিন্ন inputs ও outputs কী হতে পারে, তা বােঝার ব্যাপারও ইতিহাস আমাদের সাহায্য করে থাকে।
            বিশ্বরাজনীতিতে কারণ ও ফলাফলের (Cause and effect) মধ্যকার সম্পর্ক পরীক্ষার ক্ষেত্রেও ইতিহাস বিশেষ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু ইতিহাস রাজনীতিবিদদের পুরােপুরিভাবে বলে দিতে পারে না। যে, নতুন পরিবেশ এবং পরিবর্তনশীল বিশ্বে অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক রক্ষার ব্যাপারে কীভাবে কাজ করতে হবে। কোন একটি নির্দিষ্ট পরিবেশে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীগণ কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন ইতিহাস যেবিষয়ে তাদের যথার্থ শিক্ষা দিতে না পারলেও অতীতের ঘটনা, বৈশিষ্ট্য এবং প্রমাণিত স্বার্থের দিকে আলােকপাত করে এটা মােটামুটিভাবে সম্ভবপর কার্যধারার সন্ধান দিয়ে সহায়তা করতে পারে।

            মাঝে মাঝে বলা হয়ে থাকে যে, প্রত্যেকটা জাতি তার নিজস্ব ইতিহাস লিখে থাকে। এর ভাবার্থ। হল এই যে, বর্তমানের অনেক ঘটনা অতীতের ধারণার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। ঐতিহাসিক সত্যের বিরুদ্ধে কাজ করলে অনেক সময়ই আমাদেরকে বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে, জার্মানির চ্যান্সেলর বেথম্যান হলভেগ (Bethmann-Hollweg) ব্রিটেনের ঐতিহাসিক স্বার্থকে অগ্রাহ্য করে যখন বেলজিয়াম চুক্তি (Belgium treaty)-কে একটি গুরুত্বহীন ও লঙ্ঘনীয় ব্যাপার (a scrap of paer) বলে বর্ণনা করেছিলেন, তখন তিনি বুঝতে পারেননি যে কত বড় ভুল তিনি করতে যাচ্ছেন। হিটলারও সেরূপ ইতিহাসের শিক্ষাকে অগ্রাহ্য করে সােভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণের ফল হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছিলেন।

            আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দুটো গুরুত্বপূর্ণ দিকের উপর ইতিহাস জোর দিয়ে থাকে।

            প্রথমত, সর্বদাই একটা পরিবর্তন থাকবে এবং এই দুটো দিক আলােচনা করলে দেখা যাবে যে, প্রতিটি রাষ্ট্রের বৈদেশিক সম্পর্ক কিছু নীতিমালার উপর নির্ভরশীল।

            দ্বিতীয়ত, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেকে খাপ খাওয়াতে হবে, কারণ রাজনীতিতে কোন স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই।


            পরিশেষে বলা যায় যে, ইতিহাস চর্চা প্রয়ােজনীয় হওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অধ্যয়নে এটা একটি অপর্যাপ্ত পদ্ধতি।

            ২. দার্শনিক পদ্ধতি :
            সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত নীতিমালা দ্বারা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষণের ফলে আমরা কিছু নৈতিকতার সম্মুখীন হই। বিশেষজ্ঞগণ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনার জন্য নীতিমালা প্রণয়ন নিয়ে অনেক গবেষণা করেছেন, এই নীতিমালার উপর প্রতিষ্ঠিত একটি রাষ্ট্রের পক্ষে কী করা উচিত এবং কী করা উচিত নয়-এটা যে পদ্ধতির মাধ্যমে জানা যায়, তাকেই দার্শনিক পদ্ধতি অথবা আদর্শবাদী পদ্ধতি (Normative approach) বলা হয়। এর দুটো দিকের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।

            (ক) শক্তির রাজনীতি (Power politics) ও
            (খ) আন্তর্জাতিক আইন ও সংস্থা (International law and organization)

            (ক) শক্তির রাজনীতি : আন্তর্জাতিক সম্পর্কে শক্তি (Power) একটি মৌলিক ভূমিকা পালন করে এবং প্রতিটি রাষ্ট্র নিজ নিজ স্বার্থ উদ্ধারের জন্য একে কাজে লাগায় তা যে কোন রূপেই হােক। না কেন। কোন কোন পণ্ডিত ব্যক্তির মতে, শক্তির রাজনীতি’ কথাটি বাহুল্যমাত্র কারণ রাজনীতি কথাটির মধ্যেই শক্তির ধারণটি নিহিত আছে। যা হােক, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শক্তির রাজনীতি বলতে আমরা বনি বাষ্টের সে ধরনের প্রচেষ্টাকে, যা শুধু শক্তি অর্জন, সংরক্ষণ ও বৃদ্ধির কাজে নিয়ােজিত।

            অধ্যাপক স্পাইকম্যানের (Nicholas J. Spykman) মতে, “আন্তর্জাতিক সম্পর্কে সবাইকে রকত্ব নিতেই হবে।” ১৯৪২ সালে প্রকাশিত “America's Strategy in World Politics” গ্রন্থে তিনি বলেছেন যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবী যে কোন রূপই প্রকার কেন, শক্তি তার মৌলিক ভূমিকা ঠিকই পালন করবে, অর্থাৎ শক্তির রাজনীতি ঠিকই বিরামত Morganthau) তার “Politics Among Nations” নামক প্রসিদ্ধ

            আন্তর্জাতিক সংস্থা নিয়ে আলােচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বহু আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থা জন্ম নিয়েছে; যমন, জাতিসংঘ(United Nations), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (World Health Organization), বিশ্ব ব্যাংক (World Bank), আফ্রিকান ঐক্য সংস্থা (Organization of African Unity) ইত্যাদি। যদিও রাষ্ট্রসমূহ সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী, তথাপি এ সব সংস্থার অবদান যথেষ্ট। কারণ এই সংস্থাসমূহ রাষ্ট্রগুলােকে অন্তত এক জায়গায় বসার সুযােগ সৃষ্টি করে দেয়, যেখানে তারা নিজ নিজ বক্তব্য বলতে পারে। ছােট ছােট রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব আরও অধিক। এ কথা সত্যি যে, যে-সব ক্ষেত্রে বৃহৎ শক্তিবর্গের স্বার্থ জড়িত, সেখানে জাতিসংঘ এবং অন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ অনেক ক্ষেত্রেই সূচারুরূপে কাজ করতে পারে না। তবু বিভিন্ন আলােচনায়। যেমন- নিরস্ত্রীকরণ, যুদ্ধবিরতি, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক সহযােগিতা প্রভৃতিতে এর যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। এ সব ক্ষেত্রে এই সংস্থাসমূহের গৃহীত প্রস্তাবসমূহ আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে যথেষ্ট শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে, যা অনেক ক্ষেত্রে বৃহৎ শক্তিগুলাে অগ্রাহ্য করতে দ্বিধাবােধ করে।
            (খ) আন্তর্জাতিক আইন ও সংস্থা : ওয়েস্ট ফেলিয়া চুক্তির (Treaty of West Phalia, 1648) দু দশক পূর্বে গ্রোসিয়াস (Hugo Grotias) তার “The Law of War and Peace নামক গ্রন্থে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করে গেছেন। | আইনবিদদের মতে, কেবল আইন অনুযায়ী চললেই পৃথিবীতে নিয়মশৃঙ্খলা ফিরে আসতে পারে। হ্যান্স কেলসেন (Hans Kelsen), ফিলিপ জেসুপ (Philip C. Jessup) ও অন্য যারা আন্তজাতিক আদালতের (Intrnational Court of Justice) বিচারক ছিলেন, তাদের মতে, আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার জন্য আইন অত্যাবশ্যক এবং এর মাধ্যমেই শান্তি বিরাজ করতে পারে। | বর্তমান বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহ অধিকতর ক্ষেত্রে আইন মেনে চলে। সুতরাং আন্তর্জাতিক আইন অধ্যয়নকে আমরা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটা পদ্ধতি হিসেবে গণ্য করতে পারি। আবার অনেকের মতে আইন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে সীমিত করে। এ জন্য তারা আইন পাঠকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে একটি ফলপ্রসূ পদ্ধতি হিসেবে মেনে নিতে রাজি নন।।
            ৩. বৈজ্ঞানিক নীতি পদ্ধতি : বর্তমানে এটা সর্বজনবিদিত যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পাঠের জন্য। কোন একটি বিশেষ পাঠক্রম পূর্ণাঙ্গ তত্ত্বের যােগান দিতে পারে না। সুতরাং পণ্ডিতগণের প্রচেষ্টা হল। তত্ত্ব উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পাঠ্য বিষয় থেকে অনেকগুলাে কলাকৌশল আহরণ করে একীভূত করা, যে পদ্ধতির মাধ্যমে এটা করা হয় তাকেই বৈজ্ঞানিক নীতি পদ্ধতি নামে অভিহিত করা হয়। এই পদ্ধতির মাধ্যমে পারিপার্শ্বিক অবস্থা, বিশেষত সরকার, জনগণের উদ্দেশ্য ও তাদের নেতৃত্ব এবং সেই সাথে এগুলাের প্রতিক্রিয়ার ভিত্তি সম্পর্কে জ্ঞানের পরিধিকে প্রসারিত করা যায়।
            (ক) সিস্টেম বিশ্লেষণ : সম্প্রতি বিশেষজ্ঞগণ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অধ্যয়নের জন্য সাধারণ। সিস্টেম তত্ত্ব (General system theory)-কে প্রয়ােগের প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। এ জন্য যা করণীয় তা হল পর নির্ভর (Dependent) ও স্বাধীন (Independent) চলকগুলাের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়।
            (গ) সিদ্ধান্ত প্রণয়ন : রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আন্তর্জাতিক সিস্টেমে বিভিন্ন রাষ্ট্রের আচরণকে তাদের। সিদ্ধান্ত প্রণয়নের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়। সংকটকালীন ও দৈনন্দিন সাধারণ ব্যাপারে যে সিদ্ধান্তসমূহ গ্রহণ করা হয়ে থাকে, তা যে চলকগুলাে (Variables) সিদ্ধান্ত প্রণেতাদের হিসাবনিকাশকে প্রভাবিত করে, তার মাধ্যম বােঝা যায়। |

            (ঘ) দ্বন্দ্ব বিশ্লেষণ : দ্বন্দ্ব বিশ্লেষণের মূল বিষয়বস্তু হল কোন কোন বিশেষ রাষ্ট্রীয় আন্তঃক্রিয়া দ্বন্দ্বের রূপ পরিগ্রহ করে, সে ব্যাপারে আলােকপাত করা। কীভাবে ও কেন দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয় তা জানতে পারলে এসব দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য কী করা দরকার, সে সম্বন্ধে আমাদের ধারণা বৃদ্ধি পায়। এ ব্যাপারে বিশেষ আকর্ষণীয় দিকটি হল এমন সব দ্বন্দ্বমূলক পরিস্থিতি, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্কে। ক্রীড়া তত্ত্বের (Game theory) প্রয়ােগকে ফলপ্রসূ করে তােলে। |

            (ঙ) শক্তি গবেষণা (Peace research) : শান্তি গবেষণা কোন প্রতিষ্ঠান, পদ্ধতি অথবা তত্ত্বের সমষ্টি নয়। এটা আন্তঃবিষয়ক অধ্যয়নকারী (Interdisciplinary) এমন লােকজনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে, যাদের সবার উদ্দেশ্য থাকে কীভাবে যুদ্ধকে এড়ানাে ও শান্তির পথকে প্রশস্ত করা যায়। সাধারণভাবে শান্তি গবেষণা দ্বন্দ্ব বিশ্লেষণ সম্পর্কিত কতগুলাে কলাকৌশল ও তত্ত্ব প্রয়ােগ করে তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের পথনির্দেশ পেতে চায়। নিরস্ত্রীকরণের মাধ্যমে কীভাবে বিশ্বশান্তি আনা যায়, এ-ব্যাপারে গবেষণা চালিয়ে যাওয়া হলাে এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

            আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী করে তাদের কার্যাবলি সম্পর্কে অনুসন্ধান চালানাে। এ ছাড়াও সিস্টেম তত্ত্ব আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অধ্যয়নের জন্য আরও দুটো নতুন পদ্ধতিতে অবদান রেখেছে-সেগুলাে হল সংযুক্তি (Dinkage) ও উপযােগী আচরণ (Adaptive behaviour), সংযুক্তি পদ্ধতিতে রাষ্ট্রীয় কার্যাবলির বিভিন্ন সংযুক্তি নিয়ে অধ্যয়ন করা হয়, যাতে রাষ্ট্রীয় আচরণের একটি বিশিষ্ট নমুনা পাওয়া যেতে পারে । আর উপযােগী আচরণ পদ্ধতিতে মানুষ ও অন্যান্য জীবিত পদার্থের আচরণ লক্ষ করে আমরা বুঝতে পারি যে, সমাজ ও সরকার কোন পরিবর্তনকে কীভাবে গ্রহণ করবে। |

            (খ) কার্যকারণবাদ ও সংহতি : কার্যকারণবাদের মূল নিহিত আছে অনেক পূর্ব থেকে ধীরে। ধীরে কিন্তু চিত্তাকর্ষকভাবে বর্ধিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের মধ্যে। এই সংগঠনগুলাে বিভিন্ন রাষ্ট্রকে সাধারণ স্বার্থের বন্ধনে আবদ্ধ করে তাদের সমস্যা সমাধানের প্রয়াস পায়। সংহতির ব্যাপারেও এ কথাটি সমভাবে প্রযােজ্য।
            ৪. সিস্টেমিক পদ্ধতি :
            আন্তর্জাতিক বিষয়ে ও কার্যে মােটামুটিভাবে সামঞ্জস্য ও নিয়মশৃঙখলা যে বিদ্যমান, তা অনস্বীকার্য। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কখন, কেন ও কোনদিকে মােড় নিবে, এ সম্পর্কিত সাধারণ শ্রেণীভূক্তিকরণ (Generalization) নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে কীভাবে সংঘবদ্ধ করা যায় এবং তা কীভাবে কাজ করবে, সে সম্পর্কে ৩টি ধারণা বা মডেল নিয়ে নিচে আলােচনা করা হলাে।
            . (খ) দ্বি-মেরু শক্তি (Bipolarity) : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীতে যে আন্তর্জাতিক সিস্টেমের উদ্ভব হয়, তা দ্বি-মেরু শক্তি ব্যবস্থা হিসেবে অভিহিত। এ সময় ওয়াশিংটন ও মস্কো-এ চড়ান্ত শক্তি কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে। ফলে ঐ দুটি শক্তিকেন্দ্রই আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে প্রবলভাবে
            (ক) শক্তিসাম্য (Balance of Power) : আধুনিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে বিন্যাসকারী সিস্টেমগুলাের মধ্যে শক্তিসাম্যের ধারণাটি হলাে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী। এ পদ্ধতির উদ্ভব হয়েছে একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্র থেকে যাদের প্রত্যেকটিই সামর্থ্য ও শক্তি অনুযায়ী রাষ্ট্রের মঙ্গলের জন্য সচেষ্ট। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরােপে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে শক্তিসাম্য ব্যবস্থাই প্রধানত নিয়ন্ত্রণ করতাে। এই ব্যবস্থাটি তাদের জন্য যে সুফল বয়ে আনে, সেগুলাের মধ্যে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলাের নিরবচ্ছিন্ন অস্তিত্ব ও বৃহদাকারের যুদ্ধের অনুপস্থিতি বিশেষভাবে উল্লেখযােগ্য।
            আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী নিয়ন্ত্রণ করে। দ্বি-মেরু শক্তি ব্যবস্থা শক্তিসাম্য ব্যবস্থারই একটি বিশেষ সংস্কার। এর উল্লেখযােগ্য বােশষ্ট্য হলাে, এখানে শক্তির সাম্য দুটি প্রবল পক্ষের কার্যাবলির উপর নির্ভর করে এবং অন্যান্য।
            এ যে কোন একটি দিকে ঝুঁকে পড়ে। এরূপ অবস্থায় কোন তৃতীয় শক্তির পক্ষে সাম্যরক্ষাকারী হিসেবে কাজ করার অবকাশ থাকে না।
            | আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে একটি স্বতন্ত্র বিষয় অধীতব্য বিষয় হিসেবে গণ্য করা যায় কি না তা। বিচার করতে গেলে প্রথমে বিবেচনা করা দরকার, স্বতন্ত্র বিষয় বলতে কি বুঝায় । C. Dale Fullerএর মতে, স্বতন্ত্র বিষয় হচ্ছে এমন একটি উপাত্তের সমষ্টি যাকে প্রণালীবদ্ধ করা হয়েছে স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত। বিশ্লেষণাত্মক পদ্ধতি দ্বারা এবং যার ক্ষমতা রয়েছে যথার্থতার সাথে ভবিষ্যদ্বাণী করার। | গত তিন দশকের অধিক কালব্যাপী বিভিন্ন পণ্ডিত ব্যক্তি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যয়নের সুবিধার্থে রাষ্ট্রীয় আচরণের বিভিন্ন দিকের উপর যথেষ্ট উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন। ষাটের দশকের প্রথমদিকে Lweis E. Richardson যুদ্ধের উপর উপাত্ত সংগ্রহ করে তা পুস্তকাকারে প্রকাশ
            বিশ্বজনীনতা (Universalism) : সিস্টেমিক পদ্ধতি অনুযায়ী যে তৃতীয় ব্যবস্থাটির "ম আত্তজাতিক সম্পর্ককে বিন্যাস করা সম্ভব, তা হলাে বিশ্বজনীনতা অথবা আন্তজাতিক
            তাদাতে বিভিন্ন তাত্ত্বিক ও রাজনীতিক এই মত প্রকাশ করেছেন যে, বিশৃঙখল রাষ্ট্রীয়
            মাতার মাধ্যমে কাজ চালিয়ে যেতে পারে না, ফলত তা মানুষের সার্বিক প্রয়ােজন। মেটাতে সক্ষম নয়। তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসনতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা জেফারসন, মনরাে ৩
            " মে মুক্তি দেখান যে, সমাজের রাজনৈতিক কার্যাবলিকে সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য যেমন জাতীয় সরকার থাকা দরকার তেমনি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও এ ধরনের ” জনগণের সার্বিক কল্যাণ সাধনের জন্য অতীব প্রয়ােজনীয়। তবে তারা জাতিসংঘকে পা আন্তজাতিক সরকার হিসেবে মেনে নিতে রাজি নন, কারণ এটা বিভিন্ন রাষ্ট্রের উপর বা আইন প্রণয়ন ও প্রয়ােগ করতে পারে না।
            | ৫. একটি সারগ্রাহী পদ্ধতি : | আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অনেক বিশেষজ্ঞ বিভিন্ন পদ্ধতি থেকে প্রয়ােজনীয় উপাদান সংগ্রহ করে, এগুলাের সমন্বয়ে একটি নতুন পদ্ধতি আবিষ্কারের কথা ব্যক্ত করেছেন, যা সারগ্রাহী পদ্ধতি নামে পরিচিত।
            বিভিন্ন পদ্ধতি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষ বিশেষ দিক নিয়ে ব্যস্ত থাকে। যেমনবাস্তববাদীদের মতে, জাতীয় উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য শক্তি ও প্রভাবের উপর জোর দেয়া এবং পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়াই হলাে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কেন্দ্রীয় ধারণা। অন্যদিকে বৈজ্ঞানিক নীতি অনুসারীদের সিদ্ধান্ত প্রণয়ন সংক্রান্ত কোন মডেলই নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের প্রভাবকে যথার্থভাবে বিবেচনা করতে সক্ষম নয়। মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে গেলে অর্থনৈতিক বিবেচনা যে তাৎপর্যপূর্ণ এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই, কিন্তু শুধু অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনাই এককভাবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় কার্যাবলিকে নিয়ন্ত্রণ করে না। অনুরূপভাবে আদর্শবাদী চিন্তাভাবনা যেমন-স্বাধীনতা, শান্তি, সমৃদ্ধি, ন্যায়বিচার ইত্যাদি সমভাবে সব দেশের পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করে না।। ' সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, কোন একক পদ্ধতিই আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করার জন্য যথেষ্ট নয়। অতএব, সারগ্রাহী পদ্ধতিটি অন্য সবগুলাে পদ্ধতির কাছ থেকে প্রয়ােজনীয় অংশটুকু গ্রহণ করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে বিশ্লেষণের ব্যাপারে বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করে। একই সময় এটা স্বীকার করে নেয়। যে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মূল্যবােধ ও উদ্দেশ্যাবলী ভিন্নতর, এমনকি পরস্পর বিরােধীও হতে পারে।
            আপনি কি এটাকে স্বতন্ত্র অধীতব্য বিষয় হিসেবে মনে করেন?
            মরটন কাপলান এর নির্ণয়নের মানদণ্ড অনুযায়ী একটি অধীতব্য বিষয়ের কতগুলাে নৈপণ্য ও কলাকৌশল থাকা দরকার, থাকা দরকার কিছু তত্ত্ব ও প্রতিজ্ঞা এবং একটি বিষয়বস্ত। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ফলপ্রসূ অধ্যয়নের জন্য পণ্ডিতগণ নৈপুণ্য সহকারে অনেকগুলাে কলাকৌশল প্রণয়ন। করেছেন যেগুলাের মাধ্যমে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক উন্মােচন করা সহজতর হয়।
            করেছেন। এর এক দশক পর J. David Singer and Melvin Small তাঁদের -এর মাধ্যমে ১৯১৫ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত যেসব যুদ্ধ আরম্ভ হয়েছে, তার মােট সংখ্যা এবং সেই সাথে ঐ দীর্ঘ ১৫০ বছর পর্যন্ত সর্বমােট যে-যুদ্ধ হয়েছে তার উপাত্ত সংগ্রহ করে পুস্তকাকারে প্রকাশ করেছেন । পরবর্তী সময়ে এ উপাত্তসমূহকে নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতির মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে রাষ্ট্রীয় আচরণের ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। সুতরাং ফুলারের সংজ্ঞা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে একটি বিষয় হিসেবে গ্রহণ করা যায়।
            অধ্যাপক কুইন্সি রাইটের মতে, একটি অধীতব্য বিষয় হিসেবে স্বীকৃতি লাভের জন্য দরকার লেখকদের মাঝে এ সচেতনতাটুকু যে, এক ধরনের মিল সহকারে বিষয়টি বিদ্যমান রয়েছে। সেই সাথে বিষয়টির পরিধি এবং অন্যান্য বিষয় থেকে কোন সীমারেখা দ্বারা এটা পৃথক - এ ব্যাপারেও তাদের মধ্যে ঐকমত্য থাকা দরকার। এ দিক থেকে বিচার করলে আমরা বলতে পারি যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক একটি স্বতন্ত্র অধীতব্য বিষয় । | রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাথে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পার্থক্য হল এই যে, রাষ্ট্রবিজ্ঞান যেখানে অভ্যন্তরীণ বিষয় যেমন - সরকারের গঠন ও কার্যাবলি নিয়ে আলােচনা করে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সেখানে রাষ্ট্রের বহিঃসম্পর্ক নিয়ে সংশ্লিষ্ট থাকে। তাছাড়া কোন সরকার রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রয়ােগ করতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক যাদের আচরণ নিয়ে ব্যস্ত, সেই স্বাধীন রাষ্ট্রগুলাে যে কোন ব্যাপারে সমতার ভিত্তিতে অংশগ্রহণ করে এবং সেখানে কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ বলে। কিছু থাকে না। কোন রাষ্ট্রই তার কোন ইচ্ছাকে অপর রাষ্ট্রের উপর জোর করে চাপিয়ে দিতে পারে।
            এবং কোন আন্তর্জাতিক সংগঠনও এখন পর্যন্ত এমনভাবে গড়ে তােলা হয় নি, যা স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের উপর কর্তৃত্ব খাটাতে পারে। | আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আধুনিক ইতিহাসের, বিশেষত কূটনৈতিক ইতিহাসের পার্থক্যের দিকে দৃষ্টিপাত করলে আমরা বলতে পারি যে, যদিও উভয় শাস্ত্রই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ঘটনা নিয়ে আলােচনা করে তবু তাদের মধ্যে পদ্ধতিগত পার্থক্য বিদ্যমান। ইতিহাস সাধারণভাবে বিভিন্ন ঘটনার একটি ধারাবাহিক দলিল সংরক্ষণ করে। এখানে জোর দেয়া হয় কোন ঘটনা কখন এবং কিভাবে সংঘটিত হল তার উপর; পক্ষান্তরে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক দেখতে চায় ঘটনাটি কেন সংঘটিত হল এবং এ ব্যাপারে কার্যকর বিভিন্ন উপাদান বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি সাধারণ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে যে, ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি মােকাবিলার জন্য কী কর্মপন্থা নিতে হবে। সুতরাং আমরা দেখতে পাই যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে একটি আলাদা বিষয় হিসেবে অধ্যয়নের পেছনে যথেষ্ট যুক্তি আছে।
            সতরাং আমরা বলতে পারি, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত গবেষণা পদ্ধতিসহ রয়েছে অনেকগুলাে তত্ত্ব এবং এর বিষয়বস্তুও অন্যান্য পরিপূর্ণ বিষয় থেকে পৃথক। তাই এ ব্যাপারে। আর এখন কারও কোন সন্দেহ নেই এবং থাকা উচিত নয় যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র অধীতব্য বিষয়।
            এখন আমাদের দেখা দরকার যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কতটুকু অগ্রগতি লাভ করেছে। স্টানলি হফম্যান মনে করেন যে, বিশ্লেষণের উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্বতন্ত্রীকরণ সম্ভব এবং সেজন্য একে স্বতন্ত্র অধীতব্য বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।




            Post a Comment

            0 Comments